agrobangla

মাছ আমাদের খাদ্য তালিকায় অত্যাবশ্যকীয় অনুসঙ্গ হিসেবে চলে আসছে আবহমান কাল থেকে। ‘মাছে-ভাতে বাঙালি’ আমাদের ঐতিহ্যবাহী পরিচয়। কিন্তু দিনদিন ফুরিয়ে যেতে বসেছে আমাদের মৎস্য সম্পদ। ফুরিয়ে যেতে বসেছে আমাদের ঐতিহ্যবাহী পরিচয়। এক সময় নদীমাতৃক বাংলাদেশের খাল-বিল, হাওড়-বাঁওর, নদী-নালাগুলো ছিল নানা প্রজাতির মাছ। অফুরন্ত মাছের ভাণ্ডার হিসেবে খ্যাত কিশোরগঞ্জের হাওড়াঞ্চলসহ সারাদেশের নদী-নালা থেকে হারিয়ে যাচ্ছে দেশি প্রজাতির অনেক মাছ। জনসংখ্যা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে দিন দিন মাছের চাহিদা বাড়লেও ক্রমেই কমে আসছে মাছের যোগান। ফলে বাজারে দুষ্প্রাপ্য হয়ে পড়ছে দেশীয় প্রজাতির স্বাদু পানির মাছ। অন্যদিকে, বংশ পরম্পরায় মাছ শিকারের ওপর নির্ভরশীল মৎস্যজীবীরা প্রয়োজনীয় মৎস্য আহরণ করতে না পারায় বাধ্য হচ্ছেন মানবেতর জীবন যাপনে।

বিলুপ্তপ্রায় যে সব মাছ : এ ব্যাপারে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস্য বিজ্ঞান অনুষদের অধ্যাপক ড. মোস্তফা হোসেনের সাথে কথা হলে তিনি জানান, দেশে ২৭০ প্রজাতির মিঠা পানির মাছ পাওয়া যায়। এর মধ্যে জাতিসংঘের আইএসপিএন -এর হিসেব মতে, ৫৪ প্রজাতির মাছ বিলুপ্ত প্রায়। অথচ বিলুপ্ত মাছগুলো এক সময় দেশের বিশাল হাওড়াঞ্চলসহ খাল-বিলে প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যেত। এগুলোর মধ্যে উলে¬খযোগ্য মাছ হল : চিতল, টাকি, ফলি, এলং, বাউশ, টাটকিনি, খোকশা, কালা বাটা, নান্দিনা, ঘোড়া খুইখ্যা, সরপুঁটি, বোল, দারকিনা, মহাশোল, রাণী, আইড়, রিটা, মধু পাবদা, কাজলি, বাচা, শিলং, পাঙ্গাস, বাঘাইড়, সিসর, চেকা, গাং মাগুর, কুচিয়া, চান্দা, ভেদা, নাপিত কৈ, পিপলা শোল, তারাবাইম, শালবাইম, তেলো টাকি ইত্যাদি।

বিলুপ্তির কারণ : কৃষি জমিতে যত্রতত্র ও মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার মৎস্য সম্পদ বিলুপ্তির অন্যতম কারণ। এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি বছর যে বিপুল পরিমাণে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার করা হয় তার সিংহভাগ জলাশয়ে পতিত হয়। উলে¬খ করা যেতে পারে, ২০০৭-০৮ অর্থ-বছরে ফসল আবাদ করতে জমিতে ৪০,৯০,০০০ মেট্রিক টন রাসায়নিক সার ও ৩৭,৭৩১ মেট্রিক টন কীটনাশক প্রয়োগ করা হয়। এসব বিষাক্ত রাসায়নিক যৌগ মাছের অনুকূল পরিবেশ নষ্ট করে ফেলে। ফলে মাছ বাঁচতে পারে না বা বংশ বৃদ্ধি করতে পারে না। এছাড়া জলাশয় ভরাট, অবাধে ডিমঅলা ও পোনা মাছ নিধন, অভয়াশ্রম না থাকা, প্যানকালচার ইউনিটের আওতায় মাছ চাষ করতে গিয়ে নদী ও খাল-বিলে বাঁধ দিয়ে দেশীয় প্রজাতির মাছের অবাধ বিচরণে বাধা সৃষ্টি, কারেন্ট জালের অবাধ ব্যবহার ইত্যাদি।

বিলুপ্তপ্রায় মাছের প্রজাতি রক্ষায় করণীয় : বিশেষজ্ঞ মহল আশঙ্কা করছেন, যে হারে দেশি প্রজাতির মাছ বিলুপ্ত হচ্ছে, সে ধারা অব্যাহত থাকলে অদূর ভবিষ্যতে হাওড়াঞ্চলসহ দেশের নদ-নদীতে মাছের আকাল পড়বে। এমন একটি সময় আসবে যখন দেশি মাছ আর পাওয়াই যাবে না।

বিলুপ্তপ্রায় মাছের প্রজাতি রক্ষায় করণীয় যেসব কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে তার মধ্যে অন্যতম হল অভয়াশ্রম তৈরি করা। বাংলাদেশে উন্মুক্ত জলাশয়ে মাছের সংরক্ষণের মূল বিষয়টি হচ্ছে শুকনো মৌসুমে যখন খালে-বিলে, নদীতে পানির পরিমাণ কমে যায় সে সময় দেশীয় মাছগুলোকে রক্ষার ব্যবস্থা করা। এই উদ্দেশ্যকে সামনে নিয়ে বেশ কিছুদিন থেকেই সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে দেশের বিভিন্ন নদী ও বিলে মাছের জন্য স্থায়ী অভয়াশ্রম গড়ে তোলা হচ্ছে। মৎস্য অভয়াশ্রমের মাধ্যমে জলাশয়ের নির্দিষ্ট একটি জায়গায়

সব ধরনের মাছের জন্য নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা হয় যেখানে মাছ নির্বিঘ্নে বসবাস করতে পারে। প্রজনন ও খাদ্য গ্রহণের জন্যও অনেক মাছ অভয়াশ্রম ব্যবহার করে থাকে। স্থায়ী এই অভয়াশ্রমগুলোতে শুকনো মৌসুমেও মাছ আশ্রয় নিতে পারে। পরবর্তী বর্ষা মৌসুমে অভয়াশ্রম থেকে বিভিন্ন মাছ আশেপাশের নদী-নালা, খাল-বিলে ছড়িয়ে পড়ে। সাধারণত অভয়াশ্রমের ভেতরে এবং এর চারপাশের ২০ থেকে ৩০ মিটার জায়গায় মাছ ধরা নিষিদ্ধ করা হয়। এর বাইরে জেলেরা ইচ্ছেমত মাছ ধরতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে যে, অভয়াশ্রম স্থাপনের ফলে মাছের জীববৈচিত্র অর্থাৎ প্রজাতির সংখ্যা এবং মাছের উৎপাদন দুইই বৃদ্ধি পায়। অনেক প্রজাতির মাছ যেগুলো প্রায় বিলুপ্তির কাছাকাছি চলে গিয়েছিল বা খুবই কম পরিমাণে পাওয়া যেত, অভয়াশ্রম স্থাপনের ফলে তাদের পরিমাণও বেড়ে গেছে। ব্রিটিশ সরকারের উঋওউ এবং বাংলাদেশের ফিশারিজ রিসার্চ ফোরামের আর্থিক সহায়তায় বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস্য বিজ্ঞানী ড. মোস্তফা আলী রেজা হোসেন কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন ব্রহ্মপুত্র নদীতে মাছের ”মৎস্যরাণী অভয়াশ্রম” নামে এমনি একটি স্থায়ী অভয়াশ্রম গড়ে তুলেছেন।

’মৎস্যরাণী’ অভয়াশ্রমের প্রধান গবেষক ড. মোস্তফা হোসেন জানান, অভয়াশ্রমটি ২০০৬ সালে প্রায় এক কিলোমিটার এলাকা জুড়ে স্থাপন করা হয়েছে। প্রকল্পটি নিয়ে প্রথম দিকে স্থানীয় জেলেদের সংশয় থাকলেও বিগত চার বছর ধরে তারা এর সুফল পেতে শুরু করেছেন। নদীতে মাছের প্রাপ্যতা বেড়েছে। বেড়েছে বিলুপ্তপ্রায় দেশীয় প্রজাতির মাছের প্রাচুর্যতা। গত দশ বছর ব্রহ্মপুত্র নদে ২৫টির বেশি মাছের প্রজাতি পাওয়া যেত না। সেখানে প্রথম বছর পাওয়া গেছে ১৯টি, দ্বিতীয় বছর ৩৩টি, তৃতীয় বছর ৪২টি এবং চতুর্থ বছর ৫৭টি প্রজাতির বিলুপ্তপ্রায় মাছ। সচেতনতা বেড়েছে স্থানীয় জেলেদের। তাদের স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে ও সংশ্লিষ্টতায় সফলতার দিকে ক্রমে এগিয়ে যাচ্ছে প্রকল্পটি। সারাদেশে নদ-নদী ও হাওড়-বাঁওরে ৫৭৭টি অভয়াশ্রম চালু আছে বলে জানান ড. মোস্তফা হোসেন। এভাবে আরো অভয়াশ্রম চালু করা প্রয়োজন বলে তিনি মত প্রকাশ করেন। কেননা বিলুপ্তপ্রায় মাছের এসব প্রজাতি সংরক্ষণের জন্য সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে “মৎস্য অভয়াশ্রম” হতে পারে কার্যকর ব্যবস্থা।
এছাড়া ভরাট জলাশয়গুলো ড্রেজিং করে নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে হবে, অবাধে ডিমঅলা ও পোনা মাছ নিধন বন্ধ করতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। পদ্মা ও যমুনার মত বড় বড় নদীগুলোতে বাঁধ দিয়ে মাছ ধরা বন্ধ করতে হবে। জোরদার করতে হবে বিপন্ন প্রজাতির মাছ সংরক্ষণের জন্য গবেষণা কার্যক্রমও।

সাম্প্রতিক চিত্র : বিপন্ন প্রজাতির মাছ, কৃত্রিম প্রজনন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে রক্ষা করার জন্য বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট সম্প্রতি ছয়টি প্রযুক্তি উদ্ভাবনে সাফল্য লাভ করেছে। এ প্রযুক্তিগুলো ব্যবহার করে গবেষকরা বেশ কয়েকটি বিপন্ন প্রজাতির মাছের পোনা উৎপাদনে সক্ষম হয়েছেন। নতুন উৎপাদিত প্রযুক্তির মাধ্যমে বাটা, সরপুঁটি, কালিবাউশ, মহাশোল, মাগুর, পাবদা, কৈ, শিং প্রজাতির মাছের পোনা উৎপাদন ও চাষের কাজ শুরু হয়েছে। পাশাপাশি তেলাপিয়া ও রাজপুঁটি মাছের উন্নত প্রজাতি উদ্ভাবনও করা হয়েছে।

পরিশেষে, বিপন্ন প্রজাতির দেশীয় মাছের অবাধ বৃদ্ধি ও অভয়াশ্রম গড়ে তুলতে হবে। নতুবা হারিয়ে যাবে অনেক জীববৈচিত্র। আগামী প্রজন্ম বঞ্চিত হবে বাংলার হরেক রকমের স্বাদু পানির মাছ থেকে। কেননা বিলুপ্তপ্রায় মাছের এসব প্রজাতি একবার হারিয়ে গেলে পৃথিবীর আর কোথাও থেকে পুনরুদ্ধার করা সম্ভব নয়। এজন্য আইনের যথাযথ প্রয়োগ ও গণসচেতনতা বৃদ্ধি করা এখন সময়ের দাবি।
লেখক : মোঃ নূরুল হুদা আল মামুন, কৃষিবিদ, সম্পাদক, দ্বিমাসিক কৃষিবার্তা
তথ্যসূত্র: দৈনিক ইত্তেফাক

side banner