agrobangla

সুগন্ধি

একসময় ভারতবর্ষের পরিচিতি ছিল ‘মসলার দেশ’ বা সুগন্ধি গাছের দেশ হিসেবে। আমাদের দেশও ছিল তার ভেতর। এ উপমহাদেশ থেকে প্রচুর পরিমাণে সুগন্ধি মসলা ও গাছপালা যেত বাইরের দেশে। প্রায় ৫০০০ বছর আগে থেকেই এসব গাছের ব্যবহার ও বাণিজ্যের উল্লেখ বিভিন্ন সাহিত্যে পাওয়া যায়। শুধু ভারতীয় উপমহাদেশই নয়, এশিয়া মহাদেশজুড়ে ছিল সুগন্ধি গাছপালার প্রাচুর্য। প্রায় ২৮০০ খৃষ্টপূর্বাব্দে চীনা সম্রাট শেন নাং চীনে নিয়মিত সুগন্ধি গাছের বাজার বসাতেন আর কিনতেন নানা রকম মসলাসামগ্রী। তিনি প্রতিদিন প্রচুর সুগন্ধি মসলা খেতেন সুস্বাস্খ্যের আশায়। চীন, থাইল্যাণ্ড, ভিয়েতনাম, লাওস, কম্বোডিয়া, ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, মিয়ানমার প্রভৃতি দেশে পাওয়া যেত নানা রকমের সুগন্ধি গাছ। বলা বাহুল্য সেসব গাছের বেশির ভাগই সংগ্রহ করা হতো বনজঙ্গল থেকে। ধীরে ধীরে মানুষের চাহিদা বৃদ্ধি ও বাণিজ্যিক কারণে কিছু বিশেষ বিশেষ সুগন্ধি গাছের চাষ শুরু হয়। এখনো সে চাষাবাদ অব্যাহত আছে। কেউ কেউ বাণিজ্যিকভাবে নানা রকম সুগন্ধি গাছ আবাদ করে অন্যান্য ফসলের চেয়ে বেশি লাভবান হচ্ছেন।
সুগন্ধি গাছ আসলে কোন গাছ? এলাচ বা দারুচিনির ঘ্রাণ নিলে একধরনের সুগন্ধি ভেসে আসে, সুগন্ধি আসে পুদিনা পাতা থেকেও। এসবই সুগন্ধি গাছ। সুগন্ধি গাছে একধরনের গ্রন্থি বিভিন্ন প্রকার সুগন্ধি তেলে ভরপুর থাকে। সেসব তেলের কারণেই গাছের বিভিন্ন অংশ থেকে সুগন্ধি বের হয়। এসব গাছ খাদ্যকে সুগন্ধিযুক্ত ও সুস্বাদু করতে, প্রসাধনসামগ্রী, ওষুধ, বালাইনাশক ইত্যাদি তৈরি করতে ব্যবহৃত হয়। তাই এসব গাছ থেকে সুগন্ধি তেল আহরণ করে শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়। তবে আমাদের দেশে বেশির ভাগ সুগন্ধি গাছই মসলা হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
পৃথিবীতে প্রায় ৬০টি পরিবারের কয়েক শত সুগন্ধি গাছের সন্ধান পাওয়া গেছে। এর বেশির ভাগ গাছই সরাসরি খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এসব গাছ খাদ্যে শুধু সুগন্ধিই আনে না, সুস্বাদু করে, খাদ্যের সংরক্ষণকাল বৃদ্ধি করে। এ দেশের উল্লেখযোগ্য ও সাধারণভাবে আবাদকৃত সুগন্ধি গাছগুলো হলো মরিচ, পিঁয়াজ, রসুন, আদা, হলুদ, ধনিয়া, বিলাতি ধনিয়া, মৌরি, জৈন, মেথি, কালোজিরা, রাঁধুনি, আম আদা, পুদিনা, সুগন্ধি চাল, তেজপাতা, দারচিনি, গোলমরিচ, বাজনা ইত্যাদি। এসব গাছ এ দেশে ভালো জন্মে। আরো কিছু সুগন্ধিগাছ আছে যেগুলো এ দেশে স্বল্প আকারে হয় অথবা বনজঙ্গলে পাওয়া যায়। যেমন- কারিপাতা, পোলাও পাতা, লেবু ঘাস, ঘাগরা ইত্যাদি। অন্য দেশ থেকে এনে আমরা খাই এলাচ, জিরা, লবঙ্গ ইত্যাদি। তবে আমাদের দেশেই বনবাদাড়ে আরো অনেক সুগন্ধি গাছ আছে যেগুলোর খবর আমরা অনেকে রাখি না বা চিনি না। অপাং, বচ, বেল, কুলাঞ্জন, তারা, গোবুরা, হেলেঞ্চা, আগর, চা, কর্পুর, কমলা, জাম্বুরা, বন হলুদ, গন্ধবেনা, কদবেল, বিলাতি তুলসি, বনমল্লিকা, বেলি, চন্দ্রমূলা, ভুইচাঁপা, দোলনচাঁপা, মেহেদি, দ্রোণ, গাউচি, শ্বেতদ্রোণ, গোলাপ, পান, গোলাপজাম, পাতিজাম, গাঁদা ফুল, জোয়ান, কাশ, একাঙ্গি, চন্দন, বকুল, রজনীগìধা ইত্যাদি। এসব গাছর মধ্যে কিছু গাছ থেকে সুগন্ধি উদ্বায়ী তেল সংগ্রহ করে শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়। কিছু গাছ সরাসরি বিভিন্ন বস্তুকে সুগন্ধি করতে ব্যবহার করা হয়। কিছু গাছ সরাসরি খাদ্য হিসেবে খাওয়া হয়। সুগন্ধি ফুলগাছের ফুল থেকে সুরভিদ্রব্য বা এসেন্স, প্রসাধনীদ্রব্য, রঙ, এয়ার ফেন্সশনার, জীবাণুনাশক ইত্যাদি তৈরি করা হচ্ছে। তবে শুষ্ক সুগন্ধি ফুলের এখন নতুন কদর বেড়েছে ‘পট পৌরি’ তৈরিতে। একটা ছোট্ট পটে কিছু শুকনো সুগন্ধি ফুল রেখে সেসব পট ঘরকে সুগন্ধিযুক্ত রাখার জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে। মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম ইত্যাদি দেশে এ শিল্পের যথেষ্ট প্রসার ঘটেছে। প্রচীন মিশরীয় ও ব্যবলনীয়রা কমলা ফুল থেকে পাতন প্রক্রিয়ায় প্রাকৃতিক পারফিউম তৈরি করে ব্যবহার করতেন বলে জানা যায়। এখন সেসব ধারা যন্ত্রের কাছে পড়ে অনেক বেশি আধুনিক হয়েছে। বেলি ফুল থেকে ভারতেই এখন বাণিজ্যিকভাবে সুগন্ধি তৈরি হচ্ছে।

আমাদের দেশে পিঁয়াজ, রসুন, আদা, ধনিয়া ইত্যাদি বাণিজ্যিকভাবে চাষ হয় সত্য। তথাপি তার উৎপাদন এ দেশের চাহিদা মিটানোর জন্যও যথেষ্ট নয়। তাই প্রতি বছর বিদেশ থেকে এসব সুগন্ধি পণ্য আমদানি করতে হয়। বিদেশ থেকে এ ধরনের যা আসে সেসব পণ্যের মান ও দর্শনমূল্য অনেক বেশি। যদিও দেশী সুগন্ধি পণ্যের স্বাদ ও সুগন্ধি ওসব পণ্যের চেয়ে অনেক বেশি, তথাপি ফলন কম। এ জন্য অনেক চাষি এসব ফসল চাষে প্রথম প্রথম আগ্রহ দেখালেও পরে পিছিয়ে যান। তাই আদিজাতসমূহ মুঠ করে বসে থাকলে আমরা এখন আর বিশ্ব বাজারের সাথে সুগন্ধি গাছ উৎপাদনে পেরে উঠব না। এ দেশের চাষিদের সুগন্ধি ফসল চাষে ক্রমাগত নিরুৎসাহ ও তুলনামূলকভাবে কম লাভ হয়তো একদিন এ দেশে সুগন্ধি গাছের চাষে চরম ভাটা ডেকে আনবে। তাই যুগপোযোগী উচ্চফলা জাত উদ্ভাবন বা প্রবর্তন এখন জরুরি। বিশেষ করে যেসব সুগন্ধি গাছের উচ্চ বাণিজ্য সম্ভাবনা ও চাহিদা রয়েছে। মৌরি, মেথি, কালোজিরা ইত্যাদি এ দেশে চাষ হলেও তার উৎপাদনে কোনো পরিকল্পনা ও লক্ষ্যমাত্রা নেই। অথচ দেশীয় বাজারে এসব মসলা ফসলের প্রচুর চাহিদা রয়েছে। অনেকটা হেলাফেলা করেই এসব ফসল চাষ করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট মসলা ফসলের কয়েকটি জাত উদ্ভাবন করেছে সত্য, তবে মাঠে সেসব জাত ততটা সাড়া ফেলতে পারেনি। এসব জাতের চাষ সম্প্রসারণ ও প্রযুক্তির অনুশীলনও জরুরি। বেশির ভাগ সুগন্ধি মসলা ফসলই এ দেশের জলবায়ুতে শীত মৌসুমে ফলে। তাই আসছে শীত মৌসুমে মসলা ও সুগন্ধি ফসল চাষে এখন থেকেই আগাম পরিকল্পনা, পরিকল্পিতভাবে উপযোগী জমি ও এলাকা নির্বাচন, চাষি বাছাই ও প্রশিক্ষণ, উন্নত জাতের বীজ ও উপকরণের সরবরাহ নিশ্চিতকরণ, উৎপাদিত পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ ও বিপণন শৃঙ্খল তৈরি ইত্যাদি পদক্ষেপ নেয়া দরকার। বর্তমান সরকার মসলা ফসল আবাদে চাষিদের উদ্বুদ্ধ করার জন্য স্বল্পসুদে ব্যাংক ঋণের ব্যবস্খা করেছে। এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে সুগন্ধি ফসলের আবাদ বৃদ্ধি নিশ্চিত করতে হবে।
লেখক: মৃত্যুঞ্জয় রায়
তথ্যসূত্র: দৈনিক নয়া দিগন্ত